বিষন্ন বিকেল

      No Comments on বিষন্ন বিকেল
সালেহীন সাজু

অনেকটা স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি! গৃহবন্দি মানুষগুলো চিরদিন জানালার কাছে ছুটে যায়, আমিও তাই। জানালার ধারে বাহিরে তাকিয়ে আছি, জনমানবশূন্য পথে। হঠাৎ দেখি এলোমেলো চুলের এক যুবক এগিয়ে আসছেন আমার অ্যাপার্টমেন্টের দিকে। হাতে একটি বক্স। বক্স থেকে সাত রঙের সাতটি চক বাহির করে ফুটপাতে এঁকে দিলেন সাতটি ‘ভালোবাসা’ চিহ্ন। যুবকের এঁকে দেওয়া আলপনাগুলো অদ্ভুত ভাবে আমার বিষন্ন মনকে নাড়া দিয়ে যায়।

আমি দ্রুতই অ্যাপার্টমেন্ট থেকে নীচে নেমে আসি
এবং আলপনা আঁকা যুবকটির সাথে কথা বলতে চাই। জানতে চাই, কেন তিনি প্রতিটি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ‘ভালোবাসা’ চিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন? প্রতিউত্তরে তিনি বললেন,- ‘ভালোবাসা চিরদিন প্রাণের প্রতীক। এই নিষ্প্রাণ স্থবির জীবনে, এই আল্পনার মাধ্যমে মূলত মানুষের মনোবলকে চাঙ্গা রাখতে চাই এবং সবার মাঝে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য , সহমর্মিতা ছড়িয়ে দিতে চাই’।

সত্যিই যুবকটির কথা শুনে মূহূর্তেই যেন আমার বিষন্ন মনটি ভালো হয়ে যায়। আনমনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি সাত রঙে আঁকা ‘ভালোবাসা’র চিহ্ন খচিত আল্পনাগুলোর দিকে। তারপর চোখ ফেরাই, উপরে তাকাই, দীর্ঘ শীতনিদ্রা শেষে মৃতগাছগুলো ফুলে-ফলে, পত্র-পল্লবে জেগে উঠেছে। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা পাখিদের কিচির মিচির শব্দে মুখোরিত হয়ে উঠেছে বৃক্ষের ডালগুলো।

হঠাৎ মনে পড়ে গেলো হলিউড চলচ্চিত্রের জাদুকর স্টিভেন স্পিলবার্গ সেই বিখ্যাত উক্তিটি,-‘সব ভালো ধারণার জন্ম হয় খারাপগুলো থেকেই’। সত্যিই তো পৃথিবীর বুকে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া প্রকৃতিক দূর্যোগ এবং মহামারিতে, পৃথিবী পেয়েছে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের মত মানব সেবায় উৎসর্গকৃত নিবেদিত প্রাণ, যা আজো ইতিহাসের পাতায় স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

এইতো কিছুদিন আগে, দিল্লির দাঙ্গায় যখন কিছু উগ্র সাম্প্রদায়িক, মূর্খ ধর্মান্ধদের দ্বারা মুসলিমদের পবিত্র স্থানসহ বহু মুসলিমদের প্রাণহানি ঘটে,ঠিক তখনি আমরা দেখতে পাই প্রেমকান্তদের মত মহৎ এবং মানবিক প্রাণের ঐশ্বরিক আবির্ভাব। দিল্লিতে যখন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা চলছে, ঠিক তখনি কানাডার সানিবুক ইউনিভার্সিটিতে ড. সামিরা মুবারেকা এবং তাঁর সহযোগি ড. অর্জুন ব্যানার্জি যৌথ ভাবে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দ্বার প্রান্তে উপনীত।

আমরা অনেকেই হয়তো বুঝে কিম্বা না বুঝে কথায় কথায় বলি, আমেরিকা ধ্বংস হোক, ইজরায়েল ধ্বংস হোক, রাশিয়া ধ্বংস হোক, ব্রিটেন ধ্বংস হোক, অথচ সেই আমেরিকা, ইজরায়েল, রাশিয়া, ব্রিটেনের ল্যাব গুলোতেই মহামারি করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য রাত-দিন ঘুম হারাম করে বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন।

আমাদের অনেকেই কথায় কথায় নাস্তিকদের শির ছিন্ন করতে চাই, অথচ বহু নাস্তিক মানব সেবায় তাঁদের সারাটি জীবন উৎসর্গ করেছেন। আবার নাস্তিকদের মধ্যে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে ধর্ম ও ধার্মিক মানুষদেরকে কটাক্ষ এবং অপমান করে তাঁদের হৃদয়ে লালন করা বিশ্বাসকে অযথাই আঘাত করেন। যেখানে এই দূর্যোগে, এই ধার্মিক মানুষগুলোই নিজ নিজ প্রভুর কাছে পুরো মানবজাতির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

যিনি আস্তিক-নাস্তিক, সকল ধর্ম, বর্ণের মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি যদি সবার রিজিকের ব্যবস্থা করতে পারেন, তবে আমরা কেন এই পৃথিবীর বুকে অযথাই দাঙ্গা, প্রাণহানি, রক্তপাত ঘটাই? এই অশান্ত পৃথিবীতে আমাদের এই মূহুর্তে সবচেয়ে বেশী দরকার ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা এবং সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আমাদের পৃথিবী নামক এই গ্রহ, মহাজগতিক অন্ধকারের মধ্যে নিতান্তই অতিক্ষুদ্র একটা বিন্দু। আমাদের কাছে এমন কোন ইঙ্গিত নেই যে, অন্য কোন গ্রহ থেকে কেউ এসে আমাদেরকে করোনা কিম্বা অন্য কোন প্রকৃতিক দূর্যোগের হাত থেকে এই মানবজাতিকে উদ্ধার করবে। এইসব দূর্যোগ, মহামারি মূলত পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের। তাই আসুন, এইসব দূর্যোগে সকল সংকীর্ণ ভেদাভেদ ভুলে ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং সহানুভূতি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াই।

Please follow and like us:
error0

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *